লুৎফর সিকদার, গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষা, হাদিস চর্চা ও কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.)। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস, ইসলামী চিন্তাবিদ, সমাজসংস্কারক ও শিক্ষাবিদ। সারাজীবন তিনি ইসলামের শিক্ষা বিস্তার এবং আদর্শ মানুষ গঠনে নিজেকে উৎসর্গ করে গেছেন।
আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.) ১৩০২ বঙ্গাব্দের ২ ফাল্গুন গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটগাতী ইউনিয়নের ঘোপেরডাঙ্গা, বর্তমান গওহরডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুন্সি মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ এবং মাতার নাম আমেনা খাতুন।
শৈশবে স্থানীয়ভাবে শিক্ষাজীবন শুরু করে তিনি টুঙ্গিপাড়া ও বরিশালের সুটিয়াকাঠি স্কুলে পড়াশোনা করেন। মেধাবী ছাত্র হিসেবে ১৯১৫ সালে নোয়াপাড়ার বাঘরিয়া হাই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন।
পরবর্তীতে কলকাতা আলিয়া মাদরাসা থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে স্কলারশিপ নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি সাধারণ শিক্ষার পথ ছেড়ে ইসলামী জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষের প্রখ্যাত আলেমদের সান্নিধ্যে চলে যান।
হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর পরামর্শে তিনি সাহারানপুরের মাযাহিরুল উলূম মাদরাসায় ভর্তি হন। পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত দারুল উলূম দেওবন্দে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। তিনি আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.), শায়খুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-সহ উপমহাদেশের বহু প্রখ্যাত আলেমের কাছে হাদিস ও ইসলামী জ্ঞান অর্জন করেন।
দেশে ফিরে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ইউনুসিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর ঢাকার আশরাফুল উলূম বড় কাটারা মাদরাসা এবং জীবনের শেষ পর্যায়ে ঐতিহাসিক জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ মাদরাসায় হাদিসের দরস প্রদান করেন।
ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠে বাগেরহাটের গজালিয়া মাদরাসা, ঢাকার আশরাফুল উলূম বড় কাটারা মাদরাসা, গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদরাসা, ঢাকার জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ এবং ফরিদাবাদের জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূমসহ বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
তিনি শুধু একজন শিক্ষক বা আলেম ছিলেন না; ছিলেন সমাজের পথপ্রদর্শক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং মুসলিম সমাজের অধিকার ও ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষায়ও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
পারিবারিক জীবনেও তিনি একটি সম্মানিত ইসলামী পরিবারের অভিভাবক ছিলেন। তাঁর বড় ছেলে মাওলানা ওমর আহমদ সাহেব খেলাফত আন্দোলনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং গোপালগঞ্জ-৩ (কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়া) আসন থেকে একাধিকবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র মুফতি রুহুল আমিন সাহেব ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সাবেক খতিব। বিশিষ্ট আলেম মাওলানা আব্দুল মান্নান কাশিয়ানী (রহ.) ছিলেন তাঁর জামাতা।
জ্ঞান, প্রজ্ঞা, হাদিসের দরস এবং ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.) বাংলাদেশের ধর্মীয় ও শিক্ষাঙ্গনে যে অবদান রেখে গেছেন, তা যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ইসলামী শিক্ষা বিস্তার ও সমাজ সংস্কারে তাঁর কর্ম ও আদর্শ আজও নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।

