সাহিত্য প্রতিবেদক:
প্রতিবছর অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় অসংখ্য নতুন বই। কিছু বই পাঠককে বিনোদন দেয়, কিছু বই চিন্তার খোরাক জোগায়, আবার কিছু বই মানুষের ভেতরের সুপ্ত মানবিকতাকে জাগিয়ে তোলে। প্রখ্যাত লেখক, সাংবাদিক ও সাহিত্যগবেষক জেমস আব্দুর রহিম রানার নতুন সামাজিক-মানবিক উপন্যাস ‘নীরব ঘণ্টাধ্বনি’ সেই তৃতীয় ধারার একটি সম্ভাবনাময় সংযোজন। উপন্যাসটি পাঠককে শুধু একটি গল্প পড়তে নয়, বরং একজন শিক্ষকের অদৃশ্য জীবনসংগ্রামকে নতুন করে উপলব্ধি করতে আহ্বান জানায়।
আসন্ন অমর একুশে বইমেলায় আলোর দিশারী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে উপন্যাসটি। এর বিষয়বস্তু, প্রচ্ছদ ও মানবিক বার্তা ইতোমধ্যে সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের সাহিত্যভুবনে শিক্ষককে কেন্দ্র করে বহু গল্প ও উপন্যাস রচিত হলেও শিক্ষকতার নীরব আত্মত্যাগ, শিক্ষার্থীর প্রতি দায়বদ্ধতা, সামাজিক সম্প্রীতি, নারীর সংগ্রাম এবং মানুষ গড়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস তুলনামূলকভাবে বিরল। সে দিক থেকে ‘নীরব ঘণ্টাধ্বনি’ শুধু একটি উপন্যাস নয়; এটি একজন শিক্ষকের জীবনসংগ্রামকে সমাজ পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে তুলে ধরা একটি মানবিক আখ্যান।
উপন্যাসটির কেন্দ্রে রয়েছেন রেহানা পারভীন সুপ্তা, একজন নারী শিক্ষক। ব্যক্তিগত জীবনের ভাঙন, আর্থিক সংকট, সামাজিক কটূক্তি ও পারিবারিক নানা দায়িত্বের মধ্যেও তিনি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রাম চালিয়ে যান। তাঁর চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক বাংলাদেশের হাজারো নীরব ও আত্মত্যাগী শিক্ষকের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন।
উপন্যাসের শুরুতেই লখাইডাঙ্গা গ্রামের যে চিত্র উঠে আসে, তা পাঠককে গ্রামীণ বাংলাদেশের পরিচিত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। বাঁশবাগান, বিদ্যালয়ের ঘণ্টা, কৃষ্ণচূড়া গাছ, সরস্বতী পূজা ও ঈদের মিষ্টি বিনিময়ের মতো নানা উপাদানের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে একটি মানবিক সহাবস্থানের সমাজচিত্র। ধর্মীয় সম্প্রীতির এই উপস্থাপন কাহিনিকে যেমন সাহিত্যিক সৌন্দর্য দিয়েছে, তেমনি সমকালীন সমাজের জন্যও ইতিবাচক বার্তা বহন করেছে।
উপন্যাসের অন্যতম হৃদয়স্পর্শী অংশ রাকিব নামের এক দরিদ্র শিক্ষার্থীর গল্প। অর্থাভাবে যখন তার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম, তখন রেহানা পারভীন সুপ্তা ও তাঁর সহকর্মীরা এগিয়ে আসেন। এখানেই লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন—একজন শিক্ষক কি শুধু পাঠ্যবই পড়িয়েই তাঁর দায়িত্ব শেষ করবেন, নাকি শিক্ষার্থীর জীবনসংগ্রামের সঙ্গেও তাঁর একটি নৈতিক সম্পর্ক রয়েছে?
এই প্রশ্নই উপন্যাসটিকে সাধারণ শিক্ষাকেন্দ্রিক গল্প থেকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীর আত্মমর্যাদা ও সংগ্রাম। রেহানা পারভীন সুপ্তা কোনো কাল্পনিক সুপারহিরো নন। তিনি ভেঙে পড়েন, কাঁদেন, দুশ্চিন্তা করেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান। তাঁর মানবিক দুর্বলতা ও দৃঢ়তার সমন্বয় চরিত্রটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য ও জীবন্ত করে তুলেছে।
সাহিত্য সমালোচনার দৃষ্টিতে উপন্যাসটির ভাষা সহজ, সাবলীল ও আবেগনির্ভর। লেখক জটিল সাহিত্যিক কারুকাজের পরিবর্তে পাঠকের হৃদয়ে সহজেই পৌঁছে যায়—এমন ভাষাশৈলী বেছে নিয়েছেন। ফলে বইটি সাহিত্যবোদ্ধাদের পাশাপাশি সাধারণ পাঠকের কাছেও গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
তবে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে উপন্যাসটির কয়েকটি চরিত্র বাস্তবতার তুলনায় কিছুটা আদর্শবাদী মনে হতে পারে। সমাজের নেতিবাচক শক্তি, প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংকট আরও বিস্তৃতভাবে উপস্থাপিত হলে কাহিনির সংঘাত আরও তীব্র হতে পারত। তবে লেখকের মূল লক্ষ্য যেহেতু মানবিকতার আলোকবর্তিকা তুলে ধরা, তাই তিনি সচেতনভাবেই আশাবাদী বয়ানকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
বইটির প্রচ্ছদও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রচ্ছদের কেন্দ্রে একজন শিক্ষিকার দৃঢ় অথচ মমতাময় মুখাবয়ব, পেছনে বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের সারি এবং পাশে ঝুলন্ত বিদ্যালয়ের ঘণ্টা—এই তিনটি উপাদান পুরো উপন্যাসের দর্শনকে এক ফ্রেমে ধারণ করেছে। সোনালি আলোকিত আবহ শিক্ষার আলো ও আশার প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে। একজন শিক্ষক সামনে থাকেন, কিন্তু তাঁর আলোকিত পথ ধরে এগিয়ে যায় একটি প্রজন্ম—প্রচ্ছদটি যেন সেই বার্তাই বহন করছে।
বইয়ের শেষ প্রচ্ছদেও রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থাপনা। লেখক পরিচিতি, বইয়ের সারবস্তু এবং একটি স্মরণীয় উক্তির মাধ্যমে পুরো বইয়ের মূল দর্শন তুলে ধরা হয়েছে। উক্তিটি হলো—“একজন শিক্ষক হয়তো একটি শ্রেণিকক্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করেন; কিন্তু তাঁর শেখানো একটি মূল্যবোধ কখনো কখনো প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের জীবনকে আলোকিত করে।”
গ্রন্থটির উৎসর্গপত্রও পাঠকের আবেগ স্পর্শ করার মতো। লেখকের প্রয়াত পিতা মরহুম দাউদ আলী বিশ্বাসের স্মৃতির উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়েছে বইটি। সেখানে তাঁর পিতার সততা, মানবিকতা ও শিক্ষাপ্রেমকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন লেখক। বিশেষ করে খাকুন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিচারণ উৎসর্গপত্রটিকে দিয়েছে আবেগঘন ও ঐতিহাসিক মাত্রা।
সব মিলিয়ে ‘নীরব ঘণ্টাধ্বনি’ এমন এক সময়ে প্রকাশিত হচ্ছে, যখন শিক্ষকতার মর্যাদা, শিক্ষার উদ্দেশ্য ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন। উপন্যাসটি মনে করিয়ে দেয়—একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না; তিনি স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখেন, ভেঙে পড়া মানুষকে দাঁড়াতে শেখান এবং অদৃশ্যভাবে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন।
হাজারো নতুন বইয়ের ভিড়ে কোনো পাঠক যদি এমন একটি বই খুঁজে থাকেন, যা তাঁকে জীবনের কোনো এক প্রিয় শিক্ষককে স্মরণ করাবে, মানবিকতার শক্তিতে নতুন করে বিশ্বাসী করবে এবং শিক্ষা সম্পর্কে ভিন্নভাবে ভাবতে শেখাবে, তবে ‘নীরব ঘণ্টাধ্বনি’ হতে পারে সেই বই।
কারণ বিদ্যালয়ের ঘণ্টা একদিন থেমে যায়, কিন্তু একজন প্রকৃত শিক্ষকের শিক্ষা ও আদর্শের প্রতিধ্বনি কখনো থামে না। সেই অনন্ত প্রতিধ্বনির নামই—‘নীরব ঘণ্টাধ্বনি’।

