আবু আলম (রাকিব), শরীয়তপুর প্রতিনিধি:
শরীয়তপুরে তিন সাংবাদিককে মারধর ও কয়েকজন সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠা জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবির মধ্যেই এবার কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন তিনি। বুধবার রাতে এ বিষয়ে পালং মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দেন বিএনপির এই নেতা।
অন্যদিকে, মারধরের শিকার সাংবাদিকদের পক্ষ থেকেও থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ দেওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পার হলেও সেটি মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিকেরা।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হুমকির অভিযোগ ওঠার পরও আরিফুজ্জামান মোল্লার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। বরং শরীয়তপুরে কর্মরত কয়েকজন সাংবাদিককে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে জেলার সাংবাদিকদের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম বলেন, তিন সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় সাংবাদিক বরকত মোল্লা তাঁর অনুপস্থিতিতে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। পরে বিএনপি নেতা আরিফুজ্জামান মোল্লাও কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। দুটি অভিযোগই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে মামলা নথিভুক্ত করা হবে।
গত শনিবার রাতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলা প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। সাংবাদিকদের অভিযোগ, এ বিষয়ে প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষকে কোনো লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়নি।
ঘটনার প্রতিবাদে সময় টেলিভিশনের সাংবাদিক বিএম ইসরাফিল তাঁর ফেসবুক পোস্টে প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন ও জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমের ছবি ব্যবহার করে প্রতিবাদ জানান। এর পরদিন রোববার সকালে ইসরাফিলের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তাঁর ডান হাতের কবজি ভেঙে যায় বলে জানা গেছে।
হামলার প্রতিবাদ এবং প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার ঘটনায় রোববার বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন শরীয়তপুরে কর্মরত সাংবাদিকেরা।
কর্মসূচি চলাকালে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম ওই স্থান দিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকেরা তাঁকে ঘিরে ধরেন এবং তাঁর প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। সাংবাদিকদের এই কর্মসূচির পর বিএনপির একটি পক্ষ তাঁদের ওপর ক্ষুব্ধ হয় বলে সাংবাদিকদের অভিযোগ।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেসক্লাব ও কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। সোমবার বিএনপির একটি পক্ষ জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করে কথা বলে। পরে তাঁরা পৃথক সভা করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন।
এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার ‘শরীয়তপুর জেলার সর্বস্তরের জনগণ’-এর ব্যানারে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএনপির জেলা পর্যায়ের কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। আয়োজকদের দাবি, কয়েকশ মানুষ ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন। কর্মসূচি থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান ও ব্যানার প্রদর্শন করা হয়।
বিক্ষোভ মিছিল চলাকালে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গেলে নিউজ টুয়েন্টিফোর টেলিভিশন, জাগো নিউজ ও খবরের কাগজের প্রতিনিধি বিধান মজুমদার অনি, দ্য ডেইলি স্টারের শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা প্রতিনিধি জাহিদ হাসান রনি এবং দৈনিক এদিন ও মানবকণ্ঠের প্রতিনিধি বরকত উল্লাহকে মারধরের অভিযোগ ওঠে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লা, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমিনুর রহমান ওরফে আমানসহ কয়েকজন তাঁদের মারধর করেন।
মারধরের পর ওই দিন বিকেলে আরিফুজ্জামান মোল্লা আরও কয়েকজন সাংবাদিককে মুঠোফোনে হুমকি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে বুধবার রাতে কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে পালং মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দেন আরিফুজ্জামান মোল্লা।
জাজিরা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সোনালী নিউজের শরীয়তপুর প্রতিনিধি পলাশ খানের কাছে মুঠোফোনে দেওয়া হুমকির একটি অডিও রেকর্ড সাংবাদিকদের কাছে রয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন। সাংবাদিকদের দাবি, ওই অডিওতে আরিফুজ্জামান মোল্লাকে সাংবাদিকদের মারধরের হুমকি এবং তাঁদের ‘তালিকায়’ থাকার কথা বলতে শোনা যায়।
রোববার সকালে হামলার শিকার সময় টিভির সাংবাদিক বিএম ইসরাফিল পালং মডেল থানায় মামলা করেন। ওই মামলার আসামি পলাশ সরদার পরে ইসরাফিলের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন। দুটি মামলায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
বুধবার সন্ধ্যায় মানবকণ্ঠ ও দৈনিক এদিনের প্রতিনিধি বরকত মোল্লা পালং মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লা, শরীয়তপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমিনুর রহমান ওরফে আমান এবং যুবলীগের কর্মী রুবেল মাদবরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আরও দুজন সাংবাদিক জিডির জন্য থানায় লিখিত আবেদন করেছেন।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক বরকত মোল্লা বলেন, মামলা করার জন্য থানায় গেলে ওসি তাঁদের এড়িয়ে থানা থেকে বের হয়ে যান। পরে তাঁকে ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। পুলিশ সুপারকেও ফোনে পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সময় থানায় অপেক্ষা করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে আসতে হয়েছে।
বরকত মোল্লার অভিযোগ, পুলিশ কোনো সহযোগিতা করছে না। অন্যদিকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাঁকেসহ অন্য সাংবাদিকদের ভয় দেখাচ্ছেন।
এখন টিভির শরীয়তপুর প্রতিনিধি কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, বিনা নোটিশে প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বিএনপির একটি পক্ষের বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, তিন সাংবাদিককে মারধর করা হয়েছে। এরপরও সাংবাদিকদের অব্যাহতভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ফলে শরীয়তপুরে কর্মরত সাংবাদিকেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি এবং প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার ঘটনাগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা কোনোভাবেই হামলা, হুমকি বা হয়রানির শিকার হতে পারেন না।
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও মামলা না হওয়ায় সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি সিরাজুল হক মোল্লা বলেন, ‘ফ্যাসিস্টদের কিছু দোসর সাংবাদিকতার আড়ালে মব সৃষ্টি করে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছেন।’ রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধির সঙ্গে এমন আচরণের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিএনপিও প্রতিবাদ করেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে বিএনপির কোনো নেতা সাংবাদিকদের মারধর করেছেন—এমন তথ্য তাঁদের কাছে নেই বলে দাবি করেন সিরাজুল হক। তাঁর ভাষ্য, একজন নেতা রাগের মাথায় একজন সাংবাদিককে কিছু উল্টাপাল্টা কথা বলেছেন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। বিষয়টি তদন্ত করে ওই নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের এই ঘটনায় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হামলার অভিযোগ তদন্ত করা এবং উভয় পক্ষের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিকেরা।

