এইচ এম নাসির উদ্দিন, ঝালকাঠি প্রতিনিধিঃ
একসময় নানা আলোচনা-সমালোচনায় থাকা ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া থানা এখন মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের ছোটখাটো সমস্যা দ্রুত সমাধানের কারণে যোগদানের মাত্র ৮ মাস ২০ দিনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারির পাশাপাশি পারিবারিক, সামাজিক কিংবা স্থানীয় বিরোধ মামলা-হামলায় গড়ানোর আগেই থানায় বসে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছেন কাঁঠালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ আবু নাছের রায়হান।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কাঁঠালিয়া থানায় এর আগে একাধিক ওসি দায়িত্ব পালন করেছেন, কেউ এসেছেন, কেউ বদলি হয়ে চলে গেছেন। কিন্তু বর্তমান ওসি আবু নাছের রায়হান দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সাধারণ মানুষের মধ্যে আলাদা একটি বার্তা তৈরি করেছেন। তাঁদের মতে, বিগত আমলের তুলনায় বর্তমান ওসির কাজের ধরন অনেকটাই ব্যতিক্রমী। অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং সাধারণ মানুষের সমস্যার ক্ষেত্রে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় তাঁর কর্মকৌশলে স্পষ্ট বলে মনে করছেন তাঁরা।
কাঁঠালিয়া থানায় দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মাদক নিয়ন্ত্রণকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন ওসি নাছের রায়হান। মাদক কারবারি, সেবনকারী এবং মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মাদক সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশের এ তৎপরতায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা ও সেবনের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। অনেকেই এখন আগের তুলনায় সাবধান হয়ে চলছেন। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান যে কঠোর—সেই বার্তাও ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন মহলে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, মাদক একটি এলাকার শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই নষ্ট করে না; এর প্রভাব পড়ে পরিবার, শিক্ষা, অর্থনীতি ও তরুণ প্রজন্মের ওপর। মাদকের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের যোগসূত্র তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। ফলে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানকে তাঁরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
কাঁঠালিয়ার কয়েকজন সচেতন নাগরিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, থানায় বিভিন্ন সময়ে অনেক কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের কেউ দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন, কেউ স্বল্প সময়ের মধ্যেই বদলি হয়েছেন। তবে বর্তমান ওসি নাছের রায়হানের কাজের ধরন তাঁদের কাছে আলাদা মনে হচ্ছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দার ভাষায়, “কত ওসি আসলেন, গেলেন—সবাই নিজের মতো করে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু নাছের রায়হান অল্প সময়ের মধ্যেই থানার কার্যক্রমে একটা দৃশ্যমান গতি এনেছেন। বিশেষ করে মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান এবং সাধারণ মানুষের কথা শোনার বিষয়টি আলাদা করে চোখে পড়ছে।”
আরেক সচেতন নাগরিক বলেন, “শুধু অভিযান করলেই পুলিশিং হয় না। মানুষের সমস্যা শুনতে হয়, ছোট বিরোধ বড় হওয়ার আগেই থামাতে হয়। বর্তমান ওসির মধ্যে এই দুই ধরনের ভূমিকা আমরা দেখতে পাচ্ছি।”
তবে এসব মতামত স্থানীয়দের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন। থানার কার্যক্রমের প্রকৃত সাফল্য দীর্ঘমেয়াদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেই মূল্যায়নযোগ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কাঁঠালিয়া থানার বর্তমান কার্যক্রমে আরেকটি বিষয় স্থানীয়দের নজর কেড়েছে—ছোটখাটো বিরোধকে বড় সংঘাতে পরিণত হওয়ার আগেই সমাধানের চেষ্টা।
জমিজমা নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক কলহ, পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি, স্থানীয় দ্বন্দ্ব কিংবা অন্যান্য সামাজিক সমস্যা সময়মতো সমাধান না হলে অনেক ক্ষেত্রেই তা মারামারি, মামলা কিংবা দীর্ঘদিনের বিরোধে রূপ নেয়।
এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য শোনা এবং আইনগত সীমার মধ্যে সমাধানের সুযোগ থাকলে তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন ওসি আবু নাছের রায়হান বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
এতে কোনো কোনো বিরোধ মামলা পর্যন্ত গড়ানোর আগেই মিটে যাচ্ছে বলে দাবি তাঁদের। ফলে সাধারণ মানুষের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমছে। একই সঙ্গে থানায় মামলা ও বিরোধের চাপও কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ওসি নাছের রায়হানের কর্মকৌশলের সবচেয়ে আলোচিত দিক হিসেবে স্থানীয়রা দেখছেন—অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং সাধারণ মানুষের সমস্যার ক্ষেত্রে মানবিকতা।
মাদক কারবারি কিংবা অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ যাতে থানায় এসে নিজেদের কথা বলতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছেন তিনি।
স্থানীয়দের মতে, পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব কমলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হয়। কারণ একটি এলাকার মাদক কারবার, অপরাধ বা সামাজিক সমস্যার বিষয়ে স্থানীয় মানুষই সবচেয়ে বেশি তথ্য দিতে পারেন।
কাঁঠালিয়া থানার অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সময় নানা আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও বর্তমান সময়ে থানার কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়দের একটি অংশ।
তাঁদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনা এবং বিরোধ দ্রুত সমাধানের চেষ্টা—সব মিলিয়ে থানার প্রতি মানুষের আস্থার জায়গায় পরিবর্তন এসেছে।
একজন স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “আগে থানায় কোনো সমস্যা নিয়ে যাওয়ার আগে অনেকেই চিন্তা করতেন। এখন মানুষ অনেক সহজে কথা বলতে পারছে—এটা ভালো পরিবর্তন। তবে এই আস্থা ধরে রাখতে হলে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।”
স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ওসি নাছের রায়হান কাঁঠালিয়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন।
তাঁদের মতে, শুধু অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা না নিয়ে অপরাধের সম্ভাব্য কারণ ও সামাজিক বিরোধের দিকেও নজর দেওয়ায় তাঁর নেতৃত্বের আলাদা বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।
মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ, স্থানীয় বিরোধে দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ—এসব কার্যক্রমের সমন্বয়কে তাঁরা তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখছেন।
কাঁঠালিয়ার সচেতন মহলের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তরুণদের মাদকাসক্তি নিয়ে। তাঁদের মতে, মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তাই মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা, পরিবারকে সচেতন করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মাদকবিরোধী প্রচারণা চালানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
পুলিশের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও সচেতন নাগরিকদের একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
ওসি মো. আবু নাছের রায়হান বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে কাঁঠালিয়া থানা-পুলিশের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। মাদক কারবারি, সরবরাহকারী ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সেই যেই হউক না কেন মাদকের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। কাঁঠালিয়াকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তার নয়, মাদক নির্মূলে পরিবার ও সমাজের সহযোগিতাও প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে।
ছোটখাটো বিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো ঘটনা যেন অকারণে মামলা, হামলা বা বড় ধরনের সংঘাতে রূপ না নেয়, সেদিকেও পুলিশ নজর রাখছে। তবে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে বা অপরাধে জড়ালে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মাদকের বিরুদ্ধে কাঁঠালিয়া থানার চলমান কঠোর অবস্থান শুধু সাময়িক অভিযান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ধারাবাহিক অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি, জনসম্পৃক্ততা এবং সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমে মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
তাঁদের মতে, একজন থানার ওসির সাফল্য শুধু কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন বা কতটি মামলা হয়েছে—তা দিয়ে বিচার করা যায় না। কতগুলো অপরাধ প্রতিরোধ করা গেছে, কতগুলো বিরোধ বড় হওয়ার আগেই থামানো গেছে এবং সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ ও স্বস্তিতে আছেন—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আর সেই জায়গায় মাদকের বিরুদ্ধে কঠোরতা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সক্রিয়তা এবং সাধারণ মানুষের ছোটখাটো সমস্যায় দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিয়ে কাঁঠালিয়ায় নিজের একটি আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন ওসি মো. নাছের রায়হান—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়দের একটি অংশ।

