শাকিল হোসেন, কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি:
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। দিন-রাত মিলিয়ে গড়ে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি আরও নাজুক—কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
বিদ্যুতের দীর্ঘ সময়ের এই সংকটে শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও বাসাবাড়িতে চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। প্রায় ১০ লাখ মানুষের এই উপজেলায় বিদ্যুৎ সংকটের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, কালিয়াকৈর উপজেলায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে মৌচাক, তেলিরচালা, চন্দ্রা, হরতকিতলা, আমতলা, মাইওয়ান মোড়সহ শিল্পাঞ্চল ও গার্মেন্টস-টেক্সটাইল কারখানাগুলোর চাহিদাই ১২০ মেগাওয়াটের বেশি। তবে জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় বর্তমানে ৬০ থেকে ৭০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
কালিয়াকৈর পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, চাহিদার তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় সংযোগ সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শুক্রবার সকালে কালিয়াকৈর ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ভোগান্তির চিত্র দেখা যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালের ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী ও তাঁদের স্বজনদের তীব্র গরমে হাতপাখা ও ফাইল দিয়ে বাতাস করতে দেখা যায়।
হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. সাদিয়া তানসিম আক্তার মুনমুন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে জরুরি বিভাগের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। গর্ভবতী নারীদের সিজারিয়ান অপারেশন, রোগীদের নেবুলাইজার, অক্সিজেন কনসেনট্রেটর, এক্স-রে ও প্যাথলজি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে হাসপাতালের জেনারেটরও প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘ সময় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে কালিয়াকৈরের শিল্পাঞ্চলেও। মৌচাক, চন্দ্রা ও হরতকিতলা এলাকার বিভিন্ন গার্মেন্টসসহ শতাধিক তৈরি পোশাক কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্থানীয় বিজিএমইএ নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে রপ্তানি আদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
বিদ্যুৎ না থাকায় গভীর নলকূপ ও সেচপাম্প চালানো যাচ্ছে না। এতে আমন চাষিরা সময়মতো জমিতে সেচ দিতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। একই সঙ্গে বাসাবাড়িতে পানির পাম্প চালাতে না পারায় দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির সংকট।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কম্পিউটার ল্যাবসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে। রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধকারে চুরি-ছিনতাইয়ের ঝুঁকি বেড়েছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংকটে অতিষ্ঠ হয়ে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছে কালিয়াকৈর উপজেলা নাগরিক কমিটি ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন।
তাদের দাবি, শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় সমস্যা সমাধানে কঠোর আন্দোলন ও সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।

