শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া (খুলনা):
দূর থেকে তাকালে মনে হবে, যেন সবুজের এক বিশাল সমুদ্র। যতদূর চোখ যায়—উচ্ছে, করলা, শসা, মিষ্টি কুমড়া আর চালকুমড়ার ডাগর ডাগর পাতায় ঢেকে আছে মাঠের পর মাঠ। প্রকৃতির বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব সবজিখেত দেখলে মনে হয় জীবনের এক অপার সম্ভাবনা। কিন্তু এই নজরকাড়া সবুজের পেছনের নির্মম বাস্তবতা খুব কম মানুষেরই জানা।
ডুমুরিয়ার মাঠে মাঠে যে ফসল আজ হাসছে, তা একদিনে গড়ে ওঠেনি। টানা তিন থেকে চার মাস ধরে পরিবারের ছোট-বড় সবাই মিলে দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছেন চাষিরা। অগণিত অর্থ বিনিয়োগের পাশাপাশি সয়েছেন প্রকৃতির রুক্ষ রূপ। কখনো তীব্র রোদে পুড়ে, কখনো ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে, আবার কখনো বজ্রপাতের ভয় উপেক্ষা করে মাঠে দাঁড়িয়ে থেকেছেন তারা।
প্রতিটি চারাগাছের সঙ্গে মিশে আছে কৃষকের ঘাম। আর প্রতিটি সবজির ভেতরে লুকিয়ে আছে একেকটি পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের পড়াশোনার খরচ, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধের দাম আর বেঁচে থাকার আকুল সংগ্রাম।
তবে কৃষকের আসল লড়াই ও নির্মম অধ্যায় শুরু হয় ফসল তোলার পর, বাজারে গিয়ে।
বর্তমানে ডুমুরিয়ার পাইকারি সবজির বাজার চলে গেছে কতিপয় অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে—এমন অভিযোগ করছেন কৃষকেরা।
নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো পণ্য বিক্রির আগেই তার মূল্য নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু ডুমুরিয়ার আড়তগুলোতে ঘটছে ঠিক উল্টোটা। সকালে কৃষক তার রক্তঘামে ফলানো শসা, করলা কিংবা অন্যান্য সবজি আড়তে জমা দিয়ে আসেন। কিন্তু তখনো তিনি জানেন না, তার নিজের ফসলের দাম কত!
সারাদিন কৃষকের সবজি বিক্রি শেষে রাতের বেলা কিছু ব্যবসায়ী নিজেদের সুবিধামতো দাম নির্ধারণ করেন। কখনো কেজিপ্রতি ৮ টাকা, কখনো ১০ টাকা, আবার কখনো ১২ টাকা। কৃষকের অভিযোগ, মুক্তবাজারের নামে এটি দিনের আলোয় এক ভয়াবহ বঞ্চনা। কৃষকের মতামতের কোনো মূল্য নেই, নেই তার হাড়ভাঙা পরিশ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি। সিন্ডিকেটের ইচ্ছেমতো নির্ধারিত দরই মেনে নিতে বাধ্য হন অসহায় কৃষক।
সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, মাঠপর্যায়ে কৃষক যে সবজি ৮ বা ১০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, বাজারে সাধারণ ভোক্তাকে সেই একই সবজি কিনতে হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি দামে।
অর্থাৎ কৃষক তার ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। অন্যদিকে চড়া দামে পণ্য কিনে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ ভোক্তার। মাঝখান থেকে সিংহভাগ মুনাফা পকেটে পুরছে অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেট চক্র—এমন অভিযোগ কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের।
ডুমুরিয়ার এই বাজারব্যবস্থা ও কৃষকদের দুর্ভোগের বিষয়ে খুলনা ও ডুমুরিয়ার সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা হলে তারা কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দেন।
উপজেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. আব্দুল রাজ্জাক বলেন, ‘পণ্য জমা নেওয়ার পর রাতে দাম নির্ধারণ করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনৈতিক। কৃষি বিপণন আইনের আলোকে এটি একটি গুরুতর অপরাধ। আড়তগুলোতে ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড ও উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে দিনের শুরুতেই দাম নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকার কথা। ডুমুরিয়ার আড়তগুলোতে চাষিদের বঞ্চনা বন্ধে আমরা দ্রুতই বিশেষ নজরদারি ও অভিযান জোরদার করব। কৃষক যেন তার পণ্যের মূল্য আগে জেনে বিক্রি করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা হবে।’
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘আমাদের ডুমুরিয়ার কৃষকরা অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং খুলনাসহ সারা দেশের সবজির একটি বড় অংশের জোগান দেন তারা। মাঠপর্যায়ে বাম্পার ফলন নিশ্চিত করতে আমরা সব ধরনের কৃষি প্রযুক্তি ও পরামর্শ দিয়ে পাশে থাকি। কিন্তু বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের চক্রান্তে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের সব উৎসাহ ভেঙে পড়ে। চাষিদের ন্যায্যমূল্য পাইয়ে দিতে আমরা কৃষি বিপণন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সরাসরি কৃষক বাজার গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছি, যাতে কৃষকরা মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে ভালো দামে পণ্য বিক্রি করতে পারেন।’
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ সাবিতা সরকার বলেন, ‘কৃষকদের রক্তঘামে অর্জিত ফসলের মূল্য আড়তদাররা ইচ্ছেমতো রাতে ঠিক করবে—এমন মনগড়া নিয়ম কোনোভাবেই চলতে দেওয়া হবে না। এটি সরাসরি কৃষকের সঙ্গে প্রতারণা। এ বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে অভিযোগ পেয়েছি। অতি দ্রুত বাজারগুলোতে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনাসহ সিন্ডিকেট চক্র ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো আড়তদার বা মধ্যস্বত্বভোগীকে কৃষকের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না।’
আমরা মুখে বলি—‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে’। কিন্তু শুধু স্লোগান দিয়ে কৃষকের পেট ভরে না, রক্ষা পায় না তার পরিবার। কৃষককে বাঁচাতে হলে তাকে ফসলের ন্যায্য মূল্য দিতে হবে এবং বাজারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
ডুমুরিয়ার কৃষকদের একটাই দাবি—এই অমানবিক ও শোষণমূলক সিন্ডিকেট প্রথা দ্রুত ভাঙতে হবে। মনে রাখতে হবে, অবহেলা আর বঞ্চনায় কৃষক যদি একদিন হাল ছেড়ে দেন, তবে ক্ষুধার্ত হবে শুধু একটি পরিবার নয়—স্তব্ধ হয়ে যাবে পুরো দেশ।
তাই কৃষকের ঘামকে সম্মান জানানো এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

