আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী:
মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার জাহানাবাদ গ্রামের মোহাম্মদ আনেস খান। পিতা মৃত সেবদের খান। জীবনের শুরুটা ছিল নানা প্রতিকূলতায় ভরা। নদীভাঙনে পৈতৃক বাড়ি বিলীন হয়ে যাওয়ার পর ১৯৮০ সালে ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ফরিদপুরের শিবচর উপজেলার পাঁচচর ইউনিয়নের নারিকেলবাড়ী গ্রাম ছেড়ে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের জাহানাবাদ গ্রামে এসে বসতি গড়েন তিনি।
শুরুতে জাহানাবাদ গ্রামে একটি ভাড়া বাসায় অস্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন আনেস খান। তিন কন্যা ও দুই পুত্রকে নিয়ে ছিল তার সংসার। পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তিনি রিকশা চালাতেন। রিকশা চালিয়ে যে আয় হতো, তা দিয়েই কোনোরকমে চলত সংসার।
কয়েক বছর এভাবে চলার পর ধীরে ধীরে তার আয় বাড়তে থাকে। সংসারের খরচ মেটানোর পর অতিরিক্ত যে টাকা থাকত, তা তিনি জমিয়ে রাখতেন। একসময় কিছু টাকা সঞ্চয় হলে সেই অর্থ দিয়ে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জমি ডাক-জমা নিয়ে সেখানে সবজি চাষ শুরু করেন।
সবজি বাগানে উৎপাদিত সবজির একটি অংশ পরিবারের চাহিদা মেটাতে ব্যবহার করতেন। বাকি সবজি নিয়ে যেতেন স্থানীয় বাজারে। সেখানে বিক্রি করে যে অর্থ পেতেন, তা দিয়ে সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি আবার সবজি চাষে বিনিয়োগ করতেন। ধীরে ধীরে সবজি বিক্রির আয় বাড়তে থাকায় সবজি চাষের প্রতি তার আগ্রহ ও মনোযোগও বাড়তে থাকে।
একপর্যায়ে সবজি বাগানের আয় এবং প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বড় ছেলেকে বিদেশে পাঠান আনেস খান। ছেলে বিদেশে যাওয়ার পর পরিবারের আর্থিক অবস্থারও পরিবর্তন হতে শুরু করে। বিদেশ থেকে ছেলে টাকা পাঠালে প্রথমেই প্রতিবেশীদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করেন তিনি।
এরপর ১০ শতাংশ জমি কিনে সেখানে স্থায়ীভাবে ঘর নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে আসায় একসময় রিকশা চালানোর কাজও ছেড়ে দেন। এরপর পুরোপুরি মনোযোগ দেন সবজি চাষে।
সারা বছর মৌসুমি বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেন আনেস খান। নিজের জমির পাশাপাশি সুযোগ অনুযায়ী জমি নিয়ে সবজি উৎপাদন করেন। উৎপাদিত সবজি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে অর্জিত অর্থ দিয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহের পাশাপাশি সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা চালিয়ে যান।
বড় ছেলের আয়ের সহায়তায় ছোট ছেলেকেও বিদেশে পাঠান তিনি। দুই ছেলের উপার্জনের মাধ্যমে তিন মেয়ের বিয়ে দেন। বর্তমানে তার তিন জামাতাও প্রবাসে জীবনযাপন করছেন।
পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে আসার পর প্রবাসী বড় ছেলেকেও বিয়ে দেন আনেস খান। বর্তমানে বড় ছেলের ঘর আলো করে এসেছে একটি নাতি। দীর্ঘ সংগ্রামের পর সন্তান-সন্ততি ও নাতিকে নিয়ে এখন অনেকটাই সুখের জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।
রিকশার প্যাডেল থেকে সবজি বাগান—মোহাম্মদ আনেস খানের জীবনের এই দীর্ঘ পথচলা যেন আত্মনির্ভরতার এক অনন্য গল্প। কঠোর পরিশ্রম, সঞ্চয়ের অভ্যাস এবং সবজি চাষের প্রতি নিষ্ঠাই তাকে ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তুলেছে। তার জীবনসংগ্রাম প্রমাণ করে, সামান্য পুঁজি ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে কৃষিকাজের মাধ্যমেও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।

