মিন্টু কান্তি নাথ, রাজস্থলী প্রতিনিধি:
চারদিকে উঁচু পাহাড় আর নিবিড় অরণ্য। কাপ্তাই জেটিঘাট থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার নৌপথ পেরিয়ে আরও দুই ঘণ্টা পায়ে হাঁটতে হয় দুর্গম পাহাড়ি পথ। এরপরই দেখা মেলে এই জনপদের। কাপ্তাই, বিলাইছড়ি ও রাজস্থলী—এই তিন উপজেলার সীমান্তবর্তী ১৩০ নম্বর বারুদগোলা মৌজায় স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও গড়ে ওঠেনি কোনো বিদ্যালয়। পৌঁছায়নি বিদ্যুতের আলোও। যোগাযোগব্যবস্থার চরম প্রতিকূলতা ও দারিদ্র্যের কারণে এখানকার অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হওয়ার আগেই থেমে যেত।
অবশেষে সেই অন্ধকার দূর করতে স্থানীয়দের উদ্যোগে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘শুভধন পাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৭০ জন শিশু পড়াশোনা করছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, আশপাশের সব শিশুকে বিদ্যালয়ের আওতায় আনা সম্ভব হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সহজেই শতাধিক ছাড়িয়ে যাবে।
বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু (ভাগ্যজিৎ তঞ্চঙ্গ্যা)। এছাড়া কানাডাপ্রবাসী প্রজ্ঞাশ্রী ভিক্ষু, শ্রীলঙ্কাপ্রবাসী বিপসসি ভান্তে এবং কলেজ শিক্ষক অমর বিকাশসহ কয়েকজন শিক্ষানুরাগীর সহায়তায় বিদ্যালয়টির কার্যক্রম এগিয়ে যাচ্ছে।
ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু বলেন, “শুধু দুর্গমতার কারণে এই এলাকার শিশুরা যেন শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই তাগিদ থেকেই স্কুলটি গড়ার উদ্যোগ নিই। শিশুরা অনেক কষ্ট করে এখানে পড়তে আসে। আমাদের স্বপ্ন, এলাকার প্রতিটি শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনা।”
পাড়ার কাছেই বিদ্যালয় পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরাও। এক অভিভাবক বলেন, আগে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে দূরের বিদ্যালয়ে সন্তানদের পাঠানো প্রায় অসম্ভব ছিল। এখন পাড়াতেই স্কুল হওয়ায় ছেলে-মেয়েরা নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারছে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বিদ্যালয়টিতে রয়েছে নানা সংকট। কোনো বেতন ছাড়াই স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকরা। বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, “শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো বেতন নেওয়া হয় না। আমরা সীমিত সামর্থ্য নিয়ে কাজ করছি। কিন্তু এভাবে দীর্ঘদিন চালানো কঠিন। স্কুলটির জন্য সরকারি সহযোগিতা ও একটি স্থায়ী ব্যবস্থা জরুরি।”
বিদ্যালয়টিতে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষা উপকরণেরও অভাব রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিদিন বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ে ছুটে আসে পাহাড়ের শিশুরা। তাদের চোখে ভবিষ্যৎ বদলের স্বপ্ন।
স্থানীয়দের প্রাণের দাবি, বিদ্যালয়টি দ্রুত জাতীয়করণ করা হোক। সরকারি স্বীকৃতি ও সহায়তা পাওয়া গেলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিনা বেতনে কাজ করা শিক্ষকরা পাবেন আর্থিক নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ। এতে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারও কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু আরও বলেন, “আমরা চাই বিদ্যালয়টির সরকারি স্বীকৃতি হোক। এর ফলে দুর্গম এলাকার দরিদ্র শিশুদের জন্য শিক্ষার একটি স্থায়ী ও মানসম্মত ব্যবস্থা গড়ে উঠবে এবং শিক্ষকদেরও আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি হবে।”
সব বাধা পেরিয়ে শুভধন পাড়ার এই বিদ্যালয়টি এখন দুর্গম পাহাড়ি জনপদের মানুষের কাছে আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি উদ্যোগে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হলে পাহাড়ে শিক্ষার আলো আরও বিস্তৃত হবে এবং বদলে যাবে পিছিয়ে পড়া বহু শিশুর জীবন।

