মো. সালাউদ্দীন, পঞ্চগড় প্রতিনিধি:
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে বিধবা ভাতার টাকা উত্তোলনের অভিযোগ তদন্তে গিয়ে বিষয়টি আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তির পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের এক ইউনিয়ন সমাজকর্মীর বিরুদ্ধে। আপসে রাজি না হয়ে বিচার চাওয়ার কথা জানালে ভুক্তভোগীর মৃত স্বামীর প্রায় দুই দশক আগের একটি ঋণের প্রসঙ্গ তুলে তা পরিশোধের কথা বলা হয়েছে বলেও অভিযোগ পরিবারের।
অভিযুক্ত সমাজকর্মী মো. আশেকুর রহমান দেবীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে ইউনিয়ন সমাজকর্মী হিসেবে কর্মরত এবং টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নে দায়িত্ব পালন করছেন।
সোমবার (৩১ আগস্ট) টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের বানেশ্বরপাড়ায় ভুক্তভোগী রহিমা বেগমের বাড়িতে তদন্তের জন্য যান আশেকুর রহমান। সেখানে তিনি রহিমা বেগম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন।
ভুক্তভোগীর ছেলে জহিরউদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, “ইউনিয়ন সমাজকর্মী আশেকুর রহমান তদন্তের জন্য আমাদের বাড়িতে আসেন। তিনি বলেন, ‘মেম্বারের যে মান-সম্মান যাওয়ার, তা তো গেছেই। এগুলো নিয়ে বাড়াবাড়ি করে লাভ নেই। এর চেয়ে আপস করে নেন। আপনারা কত টাকা চান? আপনারা কী চান—টাকা নাকি বিচার?’ আমরা আপস করতে রাজি না হয়ে বিচার চাইলে তিনি বলেন, আমার বাবা ১৬ বছর আগে সমাজসেবা অফিস থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন এবং সেই টাকা পরিশোধ করতে হবে।”
জহিরউদ্দিন আরও বলেন, “আমার বাবা মারা গেছেন প্রায় ১৬ বছর হলো। স্থানীয় একজন ইউপি সদস্যের কাছ থেকে জানতে পেরেছি, ওই ঋণ আরও পুরোনো, প্রায় ২০ থেকে ২২ বছর আগে নেওয়া হয়েছিল। বিধবা ভাতার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্তের সময় প্রায় দুই দশক আগের ওই ঋণের প্রসঙ্গ তোলা হয়েছে।”
ঘটনাস্থলে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, “সমাজকর্মী যখন ঋণের বিষয়টি বলেন, তখন আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি—বিধবা ভাতার অভিযোগ তদন্ত করতে এসে এত পুরোনো ঋণের কথা কেন বলা হচ্ছে? তিনি এ বিষয়ে আর কিছু বলেননি। পরে জহিরউদ্দিনের মোবাইল নম্বর নিয়ে যান এবং ফোন দেওয়া হলে তাঁদের দেবীগঞ্জে যেতে হবে বলে জানান।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউনিয়ন সমাজকর্মী মো. আশেকুর রহমান। তিনি বলেন, “আমি অভিযোগকারীর বাড়িতে গিয়ে বিধবা ভাতার অভিযোগের বিষয়ে কথা বলেছি। কাউকে আপস বা মীমাংসার প্রস্তাব দিইনি। কথার একপর্যায়ে অভিযোগকারীর মৃত বাবার সমাজসেবা কার্যালয়ের একটি ঋণের কথা উল্লেখ করেছি। তবে ওই ঋণ পরিশোধ করতে হবে—এমন কোনো কথা বলিনি।”
দেবীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আবু রায়হান বলেন, “আশেকুর রহমান টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের সমাজকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাই তাঁকে সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগীর খোঁজখবর নেওয়া এবং তাঁদের দেবীগঞ্জে আসতে বলার জন্য পাঠিয়েছি। আপস-মীমাংসা কিংবা ঋণের বিষয়ে কথা বলতে তাঁকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। আমি ভুক্তভোগীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করব।”
দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজীত সাহা বলেন, “ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের জন্য সমাজসেবা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সঠিকভাবে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হবে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলে সেই অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, গত ২৭ আগস্ট বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে রহিমা বেগমের বিধবা ভাতার টাকা নিজের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ছয় বছর ধরে ওই ভাতার টাকা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন রহিমা বেগম।
অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর গত ৩০ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজীত সাহার স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বিষয়টি সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযোগটি তদন্ত করে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আবু রায়হানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।


