মোঃ মোস্তাকিম বিল্লাহ রাজু, ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহের ভালুকা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ গ্রহণ, সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে অসদাচরণ, অতিরিক্ত অর্থ দাবি, হয়রানি ও দাপ্তরিক কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রতিবাদে সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে কলম বিরতি কর্মসূচি পালন করেছেন অফিসের দলিল লেখকরা। কর্মসূচির কারণে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দলিল নিবন্ধন কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দলিল লেখকদের অভিযোগ, জমি ক্রয়-বিক্রয়, হস্তান্তর, দান, বণ্টনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিল নিবন্ধনের জন্য প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ভালুকা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে আসেন। তাদের মধ্যে কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও প্রবাসী পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছেন। তবে সেবা নিতে এসে অনেকেই বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন দলিল লেখক ও কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।
দলিল লেখকদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত ফি ও অন্যান্য বৈধ খরচ পরিশোধের পরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। সেই অর্থ দিতে অনীহা প্রকাশ করলে দলিল নিবন্ধনের কাজে জটিলতা তৈরি এবং সময়ক্ষেপণের অভিযোগও করেছেন তারা।
তাদের দাবি, সরকারি অফিসে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে জানানো উচিত। সরকারি বিধির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
দলিল লেখকদের আরও অভিযোগ, অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত আচরণ করা হয় না। প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে চাইলে কিংবা দলিলের কোনো বিষয়ে কথা বলতে গেলে সেবাগ্রহীতাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
কয়েকজন সেবাগ্রহীতার দাবি, দলিল নিবন্ধনের নিয়ম-কানুন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা না থাকায় তারা অফিসের সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করেন। যথাযথ সহযোগিতা না পেলে তাদের একাধিকবার অফিসে আসতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়।
দলিল লেখকদের অভিযোগ, বিভিন্ন অজুহাতে কিছু কাজ আটকে রাখা এবং অযথা সময়ক্ষেপণ করা হয়। তাদের ভাষ্য, জমি-জমা সংক্রান্ত দলিল নিবন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আইননির্ভর প্রক্রিয়া। কোনো দলিলে আইনগত সমস্যা বা কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে তা সুনির্দিষ্টভাবে সেবাগ্রহীতাকে জানানো উচিত। এতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
তবে সমস্যার বিষয়টি স্পষ্ট না করে বারবার অফিসে আসতে বাধ্য করা হলে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন বলে অভিযোগ তাদের।
অভিযোগগুলোর প্রতিবাদে দলিল লেখকরা সম্মিলিতভাবে কলম বিরতি কর্মসূচি পালন করেন। তাদের দাবি, এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তিকে হয়রানি করা নয়; বরং অফিসে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সেবাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।
দলিল লেখকদের দাবি, দলিল নিবন্ধন কার্যক্রম সরকারি আইন ও বিধি অনুযায়ী পরিচালিত করতে হবে এবং সাধারণ মানুষ যেন কোনো ধরনের অনৈতিক অর্থ লেনদেন বা হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
দলিল লেখকরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের মতে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা সম্ভব হবে।
তারা বলেন, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগের কোনো অংশ সত্য না হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
দলিল লেখক ও সেবাগ্রহীতাদের মতে, জমি-জমা সংক্রান্ত দলিল নিবন্ধন মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি দলিলের সঙ্গে মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয় ও সম্পত্তির মালিকানা জড়িত থাকে। তাই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, হয়রানি কিংবা অনৈতিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, দলিল নিবন্ধনের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি নির্ধারিত ফি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সহজভাবে তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।
স্থানীয় কয়েকজন সেবাগ্রহীতা জানান, জমি ক্রয়-বিক্রয় ও দলিল নিবন্ধনের প্রয়োজনেই তাদের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যেতে হয়। অনেকেই নিবন্ধন-সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না। ফলে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সহযোগিতা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের প্রত্যাশা, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে, যেখানে একজন সাধারণ নাগরিক কোনো ভয়, চাপ বা হয়রানি ছাড়াই প্রয়োজনীয় সেবা নিতে পারবেন। একই সঙ্গে সরকারি ফি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে সহজে তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।
ভালুকা সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ গ্রহণ, অসদাচরণ, অতিরিক্ত অর্থ দাবি ও হয়রানির অভিযোগগুলো গুরুতর। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে ভালুকা সাব-রেজিস্ট্রারের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে তুলে ধরা হবে।
দলিল লেখকদের দাবি, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভালুকা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্নে সেবা পাওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।

