আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী, শ্রীনগর (মুন্সিগঞ্জ) প্রতিনিধি:
একসময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ছিল মাটির হাঁড়ি-পাতিলের ব্যবহার। মাটির তৈরি এসব সামগ্রী শুধু রান্নার কাজেই নয়, শিশুদের খেলনা ও সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরির কারুশিল্প।
মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার বাঘড়া, ভাগ্যকুলসহ বিভিন্ন এলাকায় একসময় কুমারপাড়ায় মাটি দিয়ে তৈরি করা হতো নানা ধরনের হাঁড়ি-পাতিল, কলস, মাটির ব্যাংক ও শিশুদের খেলনা। গ্রামের গৃহবধূরা এসব মাটির হাঁড়িতে ভাত, মাছ ও সবজি রান্না করতেন।
শিশুদের জন্য তৈরি করা হতো হাঁড়ি-পাতিল, পুতুলসহ বিভিন্ন ধরনের মাটির খেলনা। এসব খেলনা নিয়ে ছোট ছোট শিশুরা আনন্দে মেতে উঠত। আবার গ্রামের অনেক মানুষ মাটির ব্যাংকে তাদের উপার্জনের কিছু অংশ সঞ্চয় করতেন।
কুমাররা মাটি সংগ্রহ করে নিজেদের হাতে এসব সামগ্রী তৈরি করতেন। একসময় ক্রেতারা প্রয়োজনীয় মাটির সামগ্রী কিনতে সরাসরি কুমারবাড়িতে ছুটে যেতেন। এছাড়া বিভিন্ন হাট-বাজার, মেলা ও উৎসবেও এসব পণ্য বিক্রি হতো।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ও অন্যান্য আধুনিক সামগ্রীর ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মাটির হাঁড়ি-পাতিলের চাহিদা কমে গেছে। ফলে অনেক কুমার পরিবার পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই কারুশিল্প।
বর্তমানে শ্রীনগরের কিছু এলাকায় সীমিত পরিসরে মাটির হাঁড়ি তৈরি হলেও তা আগের মতো ব্যাপক নয়। এসব স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা হাঁড়ি কিনে বিভিন্ন বাজারের দোকানে বিক্রি করছেন।
তবে এখনও গ্রামাঞ্চলে বিশেষ চাহিদা রয়েছে দইয়ের হাঁড়ির। বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খাবারের শেষ পর্যায়ে অতিথিদের দই দিয়ে আপ্যায়নের প্রচলন থাকায় দই তৈরিতে মাটির হাঁড়ি ব্যবহার করা হয়। এ কারণে বিয়ের মৌসুমে দইয়ের হাঁড়ি কিনতে ক্রেতাদের বাজারের দোকানে ভিড় করতে দেখা যায়।
বাজারের দোকানগুলোতে বিক্রেতারা সীমিত পরিমাণে এসব মাটির হাঁড়ি দোকানের সামনে সাজিয়ে রাখেন। প্রয়োজন অনুযায়ী ক্রেতারা সেখান থেকে হাঁড়ি কিনে নিয়ে যান।
স্থানীয়দের মতে, মাটির হাঁড়ি-পাতিল শুধু একটি ব্যবহার্য সামগ্রী নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও কুমার সম্প্রদায়ের জীবন-জীবিকা। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে কুমারদের পৃষ্ঠপোষকতা ও মাটির তৈরি পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।


