এফ.এম.এ. রাজ্জাক, পাইকগাছা (খুলনা)
ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প। কিন্তু খুলনার পাইকগাছা উপজেলার লতা ইউনিয়নের পুটিমারী আশ্রয়ণ প্রকল্পে সেই সরকারি উদ্যোগ নিয়েই উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। ৯০টি ঘরের মধ্যে প্রায় ৩০টি ঘর বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত দামে এসব ঘর হাতবদল হয়েছে।
শুধু ঘর বিক্রির অভিযোগই নয়, প্রকল্পের অধিকাংশ ঘরে বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা বসবাস না করায় সরকারি সম্পদ পড়ে আছে অরক্ষিত অবস্থায়। কোনো ঘর তালাবদ্ধ, কোনোটি পরিত্যক্ত। অনেক ঘরের চাল ও বেড়া নেই। নষ্ট হয়ে গেছে বাথরুমও। ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত আবাসন প্রকল্পের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিনে পুটিমারী মৌজার আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কিছু ঘর দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। কোনো কোনো ঘরের চাল ও বেড়া উধাও। কয়েকটি ঘরের বাথরুমও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বসবাস না থাকায় ঘরগুলো ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—যাদের জন্য সরকারের এত বড় উদ্যোগ, তাদের হাতে ঘর দেওয়ার পর যদি তারা সেখানে বসবাসই না করেন, তাহলে সেই ঘর বরাদ্দের ক্ষেত্রে যোগ্যতা যাচাই কতটা সঠিকভাবে করা হয়েছিল?
আশ্রয়ণ প্রকল্পের সম্পাদক খোকন গাজীর অভিযোগ, প্রকল্পের প্রায় ৩০টি ঘর বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ঘরপ্রতি ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘর বিক্রির অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ইয়াকুব শেখ, নাজুবর, মুজিবর রহমান, আছা সরদার, শহিদুল ইসলাম, মেরিনা বেগম, সেলিনা আক্তার, হরিদাস মণ্ডল, তপন চৌকিদার, সুদীপ্ত মণ্ডল, অনিল মণ্ডল ও হরিচাঁদসহ আরও অনেকে।
তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ বা লেনদেনের নথি এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সিরাজুল ইসলাম শাহাবুদ্দিন আশ্রয়ণ প্রকল্পের তিনটি ঘর কিনেছেন। বর্তমানে ওই ঘরগুলোতে ডেকোরেটরের ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও স্থানীয়রা দাবি করেন।
তবে সিরাজুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি নিজের বরাদ্দ পাওয়া ঘরেই বসবাস করেন এবং অন্য ঘরগুলো তিনি ভাড়া নিয়েছেন।
প্রশ্ন উঠছে—আশ্রয়ণ প্রকল্পের সরকারি ঘর ভাড়া দেওয়ার আইনগত সুযোগ আছে কি না এবং বরাদ্দ পাওয়া ঘরে অন্য কেউ ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন কি না—তা প্রশাসনের তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পে এমন কয়েকজনকেও ঘর দেওয়া হয়েছে, যাদের নিজস্ব পাকা বাড়ি রয়েছে। এ অভিযোগে ভবতোষ মণ্ডল, পরিমেল মণ্ডল, অমল মণ্ডল, জগদীশ মণ্ডল, প্রহ্লাদ মণ্ডল ও পাপিয়া মণ্ডলের নাম উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দের সময় প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের পরিবর্তে প্রভাবশালী বা সচ্ছল ব্যক্তিরা সুবিধা পেয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের বরাদ্দ বাতিল করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বরাদ্দ দেওয়ার আগে সুবিধাভোগীদের জমি, বসতবাড়ি, আয়-সম্পদ ও বাস্তব বসবাসের অবস্থা কি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল?
পাইকগাছা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফজলে রাব্বী বলেন, বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বিক্রির কথা তিনি শুনেছেন। আইনগত ব্যবস্থা নিতে হলে সময় প্রয়োজন। অনেক ঘর নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলেও জানান তিনি।
পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন, সরকারি বরাদ্দের ঘর বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। কেউ এমনটি করে থাকলে এবং তদন্তে তা প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুটিমারী আশ্রয়ণ প্রকল্পের অভিযোগগুলো কেবল ঘর বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি ঘর বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন, ঘরে বসবাসের বাস্তবতা, ঘর হস্তান্তর বা ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ এবং সরকারি সম্পদের বর্তমান অবস্থা—সবকিছুই যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের প্রতিটি ঘরের বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, জমি ও বাড়ির মালিকানা, বর্তমানে কে বসবাস করছেন এবং ঘরটি অন্য কারও কাছে হস্তান্তর বা ভাড়া দেওয়া হয়েছে কি না—এসব তথ্য প্রকাশ্য যাচাইয়ের আওতায় আনা হোক।
একই সঙ্গে যেসব ঘর অবৈধভাবে বিক্রি বা হস্তান্তরের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সরকারি নথির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে ঘরগুলো উদ্ধার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প যদি প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের পরিবর্তে সচ্ছলদের দখলে যায়, কিংবা সরকারি ঘর বেচাকেনার অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু অনিয়ম নয়—সরকারের একটি জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। তাই পুটিমারী আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৯০টি ঘরের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

